আজ : ০৮:৫২, নভেম্বর ১১ , ২০১৯, ২৭ কার্তিক, ১৪২৬
শিরোনাম :

মন্ত্রীর চিকিৎসা: কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রশ্ন


আপডেট:১০:০৫, মার্চ ২৪ , ২০১৯
photo

মাসুদ কামাল: চিকিৎসার জন্য মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে যখন সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমার মনে যে প্রশ্ন প্রবলভাবে জেগেছিল তা হলো– এই রোগের ভালো চিকিৎসা কি আমাদের দেশে সম্ভব নয়? কিন্তু সময়টি সংবেদনশীল ছিল, তাই তখন এই প্রশ্নটি উচ্চারণের সাহস পাইনি। প্রশ্নটি তখন করলে কেবল বিব্রতকরই নয়, রীতিমত ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে যেত। কে জানে, হয়তো বলা হতো- খুবই অমানবিক একটি প্রশ্ন করেছি।

আমাদের আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতদের চিকিৎসার সময়েও এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। একবার আমার এক সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়লেন, পেট কাটতে হলো। ভর্তি করা হলো আদ দ্বীন হাসপাতালে। অপারেশনে সামান্য কিছু জটিলতা দেখা দিলো। আমি তাকে দেখতে গেলাম। সেখানে অসুস্থ সহকর্মীর বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। এদের মধ্যে দু’একজনকে খুবই বিরক্ত ও উত্তেজিত মনে হলো। তারা বারবার জানতে চাইছিলেন, কেন তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হলো? ঢাকা শহরে এত ভালো ভালো হাসপাতাল থাকতে এখানে কেন? একই কথা বারবার বলাতে রোগীর অপর এক স্বজন বলে বসলেন– ভর্তি তো আমরা স্কয়ার, ইউনাইটেড কিংবা অ্যাপোলোতে করতে পারতাম। কিন্তু বিলটা কে দিতো, আপনি? এ প্রশ্নের কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। ওই ‘বিরক্ত ও উত্তেজিত’ ভদ্রলোকও আর বেশি সময় সেখানে থাকেননি।

আমরা আসলে স্বজনের চিকিৎসার জন্য সেরা হাসপাতালটির কথাই বিবেচনা করি। সবসময় যে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালেই সর্বোত্তম চিকিৎসাটি হয়, তা নয়। সরকারি হাসপাতালেও ভালো চিকিৎসা হয়ে থাকে। দেশের সেরা চিকিৎসকগণ সরকারি হাসপাতালেই কাজ করেন। আবার কিছু কিছু রোগ আছে যেগুলোর চিকিৎসা সরকারি বা বেসরকারি, বিখ্যাত কিংবা অবিখ্যাত, সকল জায়গাতে একই রকম হয়। রোগ যখন জটিল হয়, তখনই সন্ধান শুরু হয় সেই রোগের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। অথবা যেখানে এই রোগের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে, সেখানে ভর্তির চেষ্টা। যাদের বিপুল অর্থ আছে, তারা ছোটখাটো জ্বর-সর্দি হলেও সিঙ্গাপুর ব্যাংকক চলে যান। চিকিৎসাও হয়, বিনোদনও হয়।

একবার আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর হঠাৎ করে পেট ব্যথা হলো। তিনি নিজেই চলে গেলেন স্কয়ার হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন কিছু সময় অবজারভেশনে রাখতে হবে, ভর্তি হয়ে যান। বন্ধুপত্নী তাই করলেন। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে বন্ধুটি গেলেন সেখানে। তারও ঘণ্টা তিনেক পর ডাক্তাররা তাকে ছেড়ে দিলেন। ততক্ষণে ব্যথা নেই, ডাক্তাররা বললেন- তারা যে ভয় করেছিলেন, তেমন কিছু নয়। এখন চলে যেতে পারেন। স্বামী-স্ত্রী বেজার মুখে বাসায় চলে এলেন। বেজার মুখ এ কারণে যে, এরই মধ্যে বিভিন্ন টেস্ট এবং বিছানার ভাড়া বাবদ তাদের ১৮ হাজার টাকার মতো নেমে গেছে। কাগজপত্র দেখে আমাদের এক ডাক্তার বন্ধু বললেন, স্কয়ারে বন্ধুর স্ত্রীকে আসলে সে অর্থে কোনও চিকিৎসাই দেওয়া হয়নি। তার ওই ব্যথাটাও কোনও জটিল কারণে হয়নি। বাসায় আরও কিছু সময় থাকলে হয়তো এমনি এমনিই ভালো হয়ে যেত।

আমার বন্ধুটি যদি ধনাঢ্য হতেন, তাহলে হয়তো এই ১৮ হাজার টাকার জন্য মোটেই মন খারাপ করতেন না, কারও সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র স্কয়ারের নামে একগাদা বদনাম করতেন না। বরং এই ভেবে খুশি হতেন, এই সুযোগে তার স্ত্রীর অনেকগুলো টেস্ট হয়ে গেলো, এবং জানা গেলো সম্ভাব্য বেশ কটি রোগের আশু আশঙ্কা তার নেই। সেই সঙ্গে হয়তো ফ্রি উপদেশ দিতেন- রোগ যত ছোটই হোক, সেটিকে উপেক্ষা করা যাবে না। বড় কোন হাসপাতালে যেতে হবে, দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। সম্ভাব্য আর কোনও রোগের আশঙ্কা আছে কিনা, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে হবে।

কাজেই চিকিৎসা কোথায় করানো হবে, কোন হাসপাতালে নেওয়া হবে, সেসব নির্ভর করে হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো, ডাক্তারের যোগ্যতা এবং সবশেষে রোগীর অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর। জ্বরের চিকিৎসা অ্যাপোলো বা ইউনাইটেড হাসপাতালে যেমন হয়, তেমন সরকারি হাসপাতালেও হয়, আবার ফার্মেসি থেকে ছয় টাকা দিয়ে একপাতা প্যারাসিটামল কিনে নিয়ে খেলেও চলে। প্রশ্নটা হচ্ছে, নিশ্চিত চিকিৎসাটা আছে কিনা। যদি হাতের কাছেই নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা থাকে, তাহলে দূরবর্তী অভিজাত হাসপাতালে যেতে হবে কেন? আমার প্রশ্নটা ছিল ঠিক এখানেই।

ওবায়দুল কাদেরের যে অসুখটা হয়েছিল, শারীরিক যে জটিলতাটি হয়েছিল, তার ভালো চিকিৎসা কি আমাদের দেশে ছিল না? এখনও কি নেই? তাহলে যে প্রায়ই শুনি হৃদরোগের বিশ্বমানের চিকিৎসা রয়েছে আমাদের দোরগোড়ায়- সেগুলো কি কেবলই বিজ্ঞাপনের ভাষা? বাস্তবতার ছিটে ফোটাও কি নেই সেখানে? কিংবা যদি মিথ্যাচারভিত্তিক হয়ে থাকে সেই বিজ্ঞাপন, তাহলে এই প্রতারণা কেন দিনের পর দিন করতে দিচ্ছে আমাদের সরকার?

যখন রিপোর্টিং করতাম, বেশ লম্বা সময় আমি হেলথ বিটে কাজ করেছি। সে কারণে আজকে যারা দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে। সেরকমই একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দিন কয়েক আগে কথা হলো। জানতে চাইলাম, ওই কথাটাই। ওনার যে রোগ তার ভালো চিকিৎসা কি আমাদের দেশে নেই? তিনি হাসলেন। বললেন- এর চেয়েও অনেক জটিল হৃদরোগের চিকিৎসা এদেশে প্রতিদিনই হয়। একাধিক হাসপাতালে হয়। তারপর একটু থেমে, বিরতি দিয়ে, বলবেন কী বলবেন না- এমন একটু চিন্তা করে, বললেন- সমস্যাটি ছিল আসলে রোগ নিয়ে নয়, রোগী নিয়ে। উনি একজন ভিআইপি রোগী। যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে কি সামলানো যেতো? অথচ যে কোনও ছোট খাট রোগের ক্ষেত্রেও যে কোনও সময় অঘটন ঘটতে পারে। এদেশে ডাক্তারদের ক্ষেত্রে মানুষের সহনশীলতা কম। তখন ওই বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা কে করতো? তাই ডাক্তাররা কোনই ঝুঁকি নিতে চায়নি। তবে হাসপাতালটি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় না হয়ে যদি ইউনাইটেড, বারডেম কিংবা হার্ট ফাউন্ডেশনও হতো, তাহলে কিন্তু এনিয়ে ডাক্তাররা কোনও ঝুঁকিই অনুভব করতেন না।

সরকারি হাসপাতালে এধরনের রোগীর ভালোমন্দের ওপর চিকিৎসকদের চাকরিজীবনের পুরস্কার বা তিরস্কারের বিষয়গুলো নির্ভর করে। সে কারণেই হয়তো ন্যূনতম ঝুঁকিও নিতে চায় না কেউই। এই যদি হয় চিকিৎসকদের মানসিক অবস্থা, তাহলে পেশাদারিত্বটা আর থাকছে কোথায়?

একটি বেসরকারি হাসপাতাল, যারা হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য বেশ পরিচিত, তার এক কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, আচ্ছা দেবী শেঠি এসে কী বলেছিলেন, মনে করতে পারেন? দু’টো কথা মনে করুন, প্রথমত বললেন- বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে রোগীর বিষয়ে যা যা ব্যবস্থা নিয়েছে তা বিশ্বমানের। আর দ্বিতীয়ত- শরীরের যা অবস্থা এখন চাইলে সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতে পারেন। ওনার দুই কথা থেকে কী মনে হয়, এই রোগের চিকিৎসা আমাদের দেশে সম্ভব ছিল না? হৃদরোগের জন্য সবচেয়ে ক্রুসিয়াল মোমেন্টস হচ্ছে প্রথম কয়েক ঘণ্টা। সে সময়টায় যদি আমাদের হাসপাতাল ও চিকিৎসকরা বিশ্বমানের সেবা দিতে পারে, তাহলে পরে পারবে না কেন? এরপর তিনি আর একটি মোক্ষম কথা বললেন। তিনি বললেন- বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল আমাদের দেশের সেরা হাসপাতাল। কিন্তু তাই বলে- সকল রোগের জন্যই কিন্তু এটা সেরা নয়। সরকারি পর্যায়েই এদেশে বিশেষায়িত কিছু হাসপাতাল আছে, সেগুলো সেই রোগের জন্য সেরা। দেশের সরকারি বেসরকারি সকল হাসপাতালের মধ্যে হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালকে কিন্তু কেউই সেরা বলবেন না।

আমি তার সঙ্গে একমত হলাম। মনে পড়লো, ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে যখন হইচই চলছিল, তখন হৃদরোগ চিকিৎসার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত এমন একজনকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই যদি আমি হৃদরোগে আক্রান্ত হই, আমাকে কোথায় নিয়ে ভর্তি করবেন? বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে? তিনি বললেন- অবশ্যই নয়।

তিনি বললেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের নাম আসবে পরে। তার আগে হৃদরোগের চিকিৎসার কথা বলতে গেলে আসবে- হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বারডেম, হার্ট ফাউন্ডেশন, ইউনাইটেড ও ল্যাব এইড হাসপাতালের নাম।সেই সঙ্গে তিনি একটা প্রশ্নও করলেন, দেশের দশজন সেরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কেউ কি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন?

এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে ওবায়দুল কাদেরের মতো হেভিওয়েট রাজনীতিবিদকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে ভর্তি করা হলো কেন? আমাদের দেশে ডাক্তারদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যায়, রোগী কাছের কেউ হলে তাকে নিয়ে নিজে যেখানে কাজ করেন সেখানেই ভর্তি করান। ভাবেন- তাহলে তিনি তার আন্তরিকতা দিয়ে রোগীর চিকিৎসা ও সেবা দু’টোই করতে পারবেন। কিন্তু একথা তো সবাই মানবেন যে, জটিল রোগের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি হচ্ছে যথাযথ বিশেষায়িত চিকিৎসা।

লেখার শুরুতে যে মানসিকতার কথা বলেছিলাম, সেই প্রসঙ্গে আরও একবার আসি। পাঠকরা হয়তো মনে করতে পারবেন ২০০৮ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, তখন একেবারে শুরুর দিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাথরুমে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। তার ডান পায়ের হিপবোন ভেঙে যায়। চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারি খরচে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেই সময়ে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক রুহুল হক। তিনি নিজে দেশের সবচেয়ে নামকরা অর্থোপেডিক সার্জন। এই ধরনের কোমরে হাড় ভাঙা রোগের চিকিৎসা তিনি তার জীবনে হাজার খানেক নিশ্চয়ই করেছেন। তখন তিনি কিন্তু একবারও বলেননি- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চিকিৎসা তিনিই করতে পারবেন, সিঙ্গাপুর যাওয়ার দরকার নেই। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রীই যেখানে ঝুঁকি নিতে চান না, উদ্যোগ নিতে পারেন না, তখন অন্যদের কথা বলে আর লাভ কি।

লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলা ভিশন

Posted in মতামত


সাম্প্রতিক খবর

বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে কমিউনিটির ক্ষোভ

photo শামসুল আলম চৌধুরী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ট সংগঠক ও খাঁটি দেশপ্রেমিক নেতা বিশেষ প্রতিনিধিঃআজ ১০ ই নভেম্বর রবিবার রাতে বাংলাদেশ সেন্টার লণ্ডন কর্তৃক আয়োজিত শোক সভায় বক্তারা বলেছেন যে- ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃটেনে মুক্তিযুদ্ধের একজন বলিষ্ট সংগঠক ছিলেন মরহুম শামসুল আলম চৌধুরী।তিনি বাংলাদেশ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী ও বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সচিব হিসাবে

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment