আজ : ১০:০৬, এপ্রিল ২৪ , ২০১৮, ১১ বৈশাখ, ১৪২৫
শিরোনাম :

জয়দেবপুরের পথ ধর - বাংলাদেশ স্বাধীন করঃ স্মৃতির অন্তরালে ১৯ মার্চ ১৯৭১


আপডেট:০২:৩১, মার্চ ৩০ , ২০১৮
photo

এম এ আজিজঃ ১৯৭০ সালে অনুষ্টিত নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তৎকালীন পাকিস্তানী সামরিক জ্যান্তা বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত ষড়যন্ত্র শুরু করে । তাদের চক্রান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে লক্ষাধিক পান্জাবী সেনা এনে পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েন এবং অস্ত্র ভান্ডার মওজুত করেন । চক্রান্তের দ্বিতীয় ধাপে ছিল সেনা বাহিনী, ইপিআর, ও পুলিশ বাহিনীতে নিয়োজিত বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে গোপনে নিরস্ত্র করার মাধ্যমে অপারেশন সার্চ লাইটের বাস্তবায়ন । পান্জাবীদের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন বাংলার অভিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের । যাকে সমর্থন করে গগণবিধারী আওয়াজ তুলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী । অপরদিকে ২ মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চে পল্টন ময়দানের জনসভায় স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ । ৭ মার্চ রেইসকোর্সের ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু "এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। অপরদিকে ৯ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী হুঙ্কার দিয়ে বলেন আমরা স্বাধীন নই, আমরা পরাধীন। এবার আমরা সবকিছু উম্মোচন করিয়া বিদ্রোহ করিব । যুদ্ধ করিয়া স্বাধীন হইবো। বঙ্গবন্ধু ও মওলানার ডাকে দেশের প্রগতিশীল ছাত্র, যুবক, শ্রমিক-জনতা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রোএ্যাকটিভ ভূমিকা পালন করেন। এবং প্রথমবারের মত জাতি হিসাবে আমরা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি । একাত্তরের এই অসহযোগ আন্দোলন ছিল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও দলমত নির্বিশেষে গড়ে উঠা ঐক্যে বাঙ্গালীর ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জলতম গণজাগরণ । যা দাবানলের মত ছড়িয়ে পরেছিল টেকনাফ থেকে তেতুলীয়া তথা সমগ্র বাংলাদেশে ।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলমান অসহযোগ আন্দোলনকে সফল ও চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে বীর প্রসবিনী জয়দেবপুর বর্তমান গাজীপুরের শ্রমিক জনতা গঠন করে সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ । যার হাই কমান্ড ও অ্যাকশন কমিটি নামে দুটি শাখা ছিল । হাই কমান্ডে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত হাবীবউল্লাহ ( সাবেক সাংসদ ), প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা পরবর্তিতে সংসদ সদস্য এম,এ, মোত্তালিব এবং প্রগতিবাদী ডাঃ মনিন্দ্রনাথ গোস্বামী । অপরদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আ,ক,ম, মোজাম্মেল হক ( গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ) কে আহ্বায়ক ও নজরুল ইসলাম খান( বর্তমানে বিএনপি'র স্হায়ী কমিটির সদস্য ) কে কোষাধক্ষ্য করে এলাকার প্রগতিশীল শ্রমিক, ছাত্র- যুবক, শিক্ষক,রাজনীতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যাবসায়ি নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল অ্যাকশন কমিটি । তাদের নের্তৃত্বে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ জয়দেবপুর গাজীপুর টঙ্গীর শিল্পীন্চলে প্রতিদিন মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ পালন করে গড়ে তোলা হয়েছিল অপ্রতিরুদ্ধ অসহযোগ আন্দোলন ।

দেশের সামগ্রিক অবস্হা সংকটজনক। তখন ডাক আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসভার । অগ্রজ এম,এ,মোত্তালিবের নের্তৃত্বে জয়দেবপুর, টঙ্গী, ফতুল্লা, ডেমরা, বাওয়ানী, আদমজী, সিদ্ধিরগন্জ, ও নারায়নগন্জ শিল্পান্চল থেকে ৭০ টি বাস/ট্রাক বোঝাই করে কয়েক হাজার শ্রমিক- জনতা গজারির লাঠি ও মাথায় লাল সালু কাপড়ের ব্যাজ পড়ে রেসকোর্সের ঐতিহাসিক জনসভায় যোগদান করেছিল ।
উল্লেখ্য যে এই উত্তাল গণজাগরণের সময় আমার অগ্রজ এম, এ, মোত্তালিব যিনি মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীতে চাকুরীরত ছিলেন । তখন একাধারে তিনি মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি শ্রমিক ইউনিয়ন সহ ইস্ট পাকিস্তান ইন্ড্রাসট্রিয়েল ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক তথা জয়দেবপুর-টঙ্গী শিল্পান্চলের শ্রমিকদের নেতা ছিলেন । তার সাথে সহাবস্হানের সুবাদে আমি তখন ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে অধ্যায়নরত ছাত্র ছিলাম। ফলে অসহযোগ আন্দোলন সহ ৭ ও ৯ মার্চে অনুষ্ঠিত রেইসকোর্স ও পল্টন ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভাসমূহে যোগদান এবং জয়দেবপুর বর্তমান গাজীপুরে পান্জাবী সৈনিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

ঐতিহাসিক রেইসকোর্স ময়দানে বাংলার অভিসাংবাদিত নেতা বঙ্গঁবন্ধুর মুখে "এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামের" ডাকে উজ্জিবিত হয়ে সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের হাই কমান্ড ও অ্যাকশন কমিটির নেতৃবৃন্দ উদ্ভুদ্ধ যে কোন পরিস্হিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন । পান্জাবী সৈন্যরা যাতে জয়দেবপুরে আসতে না পারে সেজন্য জয়দেরপুর থেকে টঙ্গী ও রাজেন্দ্রপুরে অবস্হিত অস্ত্র কারখানা প্রর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যারিকেট গড়ে তোলেন । একইসাথে ভাওয়াল রাজবাড়ীতে অবস্হিত ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পান্জাবী সেনা সদস্য তথা সমরাস্ত্র কারখানা, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী ও ডিজেল প্ল্যান্টে কর্মরত সকল বিহারী ও উর্দু ওয়ালাদের গতিবিধি পর্য্যবেক্ষন করার জন্য সকলকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ প্রদান করেন । উল্ল্যেখ্য যে, সমরাস্ত্র কারখানার এম,ডি ছিলেন পান্জাবী ব্রিগেডিয়ার করিমউল্লাহ । তাকে শ্রমিক নেতা মোত্তালিবের নির্দেশে হাজার হাজার শ্রমিক ঘেরাও করে রাখে এবং তার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় । শিল্পান্চলে কর্মরত অন্যান্য বিহারী ও পান্জাবী শ্রমিক/কর্মচারীর গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য সকলকে নির্দেশ প্রদান করা হয় । ফলে জয়দেবপুর শিল্পান্চল হয়ে উঠেছিল ছিল উত্তপ্ত । এই ভয়াবহ পরিস্হিতিতে আমাদের খবর নেওয়া ও দেখার জন্য হবিগঞ্জ থেকে আমাদের বয়োবৃদ্ধ পিতা আমার আরেক অগ্রজকে সাথে নিয়ে জয়দেবপুরে এসে হাজির হলেন ।

এখানে উল্ল্যেক্ষ থাকা প্রয়োজন যে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ীতে ছিল ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তর । যার অধিনায়ক ছিলেন বাঙ্গালী অফিসার লেঃ কর্নেল মাসুদুল হোসেন খান, সহ অধিনায়ক মেজর শফিউল্ল্যাহ ( যিনি তখন রুটিন ওর্য়াকে ময়মনসিংহে ছিলেন )। তার দায়ীত্বে ছিলেন আরেক বাঙ্গালী মেজর মইনুল হুসেন চৌধুরী । তারা সকলেই অসহযোগ আন্দোলনের নিরব সমর্থক ছিলেন । পূর্ব পরিচিতির সুবাদে এম,এ, মোত্তালিবের সাথে মেজর শফিউল্লাহ ও মেজর মঈনুল হুসেন চৌধূরীর ছিল ঘনিষ্ট যোগাযোগ । অসহযোগ আন্দোলনের ফলে জয়দেবপুর-গাজীপুরের শিল্পীন্চল সহ সমগ্র টঙ্গী শিল্পীন্চলের পরিস্হিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে । অসহযোগ আন্দোলনকে দমন করে রাজবাড়ীতে অবস্হিত ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে নিরস্ত্রকরন এবং সমরাস্ত্র কারখানার এম,ডি ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাহকে ঘেরাও থেকে মুক্ত করে অস্ত্র কারখানা নিয়ন্ত্রনে নেওয়ার লক্ষ্য ঢাকা সেনা সদর দপ্তর থেকে ১৯ মার্চ দুপুরে এক কোম্পানী পান্জাবী সৈন্য সাথে নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব ইস্ট বেঙ্গল ২য় রেজিমেন্টের সদর দপ্তর এসে হাজির হন । এদিকে বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে নিরস্ত্র করার জন্য ঢাকা সেনানিবাস থেকে পান্জাবী সৈন্য আসার খবর জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পরে । পান্জাবীদের চক্রান্ত আঁচ করতে পেরে উদ্ভুদ্ধ পরিস্হিতি মোকাবেলায় শ্রমিক জনতা কি ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য মেজর মঈন শ্রমিক নেতা মোত্তালিব সহ আওয়ামী লীগ ও মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেন । মেজর মঈনের কাছ থেকে বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে নিরস্ত্র করার তথ্য পাওয়ার পর সর্বদলীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের হাই কমান্ড ও অ্যাকশন কমিটির নের্তৃন্দ জরুরী ভিত্তিতে আলোচনায় বসেন । বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে যাতে কোন অবস্থাতেই নিরস্ত্র করতে না পারে সে জন্য যে কোন মূল্যে পান্জাবী সৈনিকদের সকল প্রকার চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করার জন্য শপথ নেওয়া হয় । রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেট সৃষ্টি করে প্রস্তুতি নিতে থাকেন । রাজবাড়ীতে পান্জাবীদের উপস্হিতি ও তাদের ষড়যন্ত্রের কথা ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র জয়দেবপুর ও শিল্পান্চলে শ্রমিক জনতার মাঝে উত্তেজনা দাবানলের মত ছড়িয়ে পরে ।

এমনি ভয়াবহ পরিস্হিতিতে হাই কমান্ড এম,এ, মোত্তালিব তরিৎ গতিতে ফ্যাক্টরীর সাইরেন বাজিয়ে রাজবাড়ীতে পান্জাবীদের আগমনের বর্তা শ্রমিক-জনতার কাছে পৌছেদেন । এবং মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী, অস্ত্র কারখানা ও ডিজেল প্ল্যান্টের অন্যান্য সহকর্মী যথাক্রমে সর্বজনাব নজরুল ইসলাম খান, মোশাররফ হোসেন, সাইদূল হক, গিয়াস উদ্দীন ও রিয়াজুল হক প্রমূখ নের্তৃবৃন্দ হাজার হাজার বিক্ষুব্দ শ্রমিক কর্মচারী তথা এলাকার ছাত্র, যুবক জনতাকে সাথে নিয়ে বাস, ট্রাক, মটরযানে জয়দেবপুর বাজারে এসে হাজির হন । দিনটি ছিল শুক্রবার এবং জয়দেবপুরের হাট বার । হাটে ও জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য জয়দেবপুর বাজারে এমনিতেই হাজার হাজার লোকের ছিল উপস্হিতি । অ্যাকশন কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ স্কুল, কলেজের ছাত্র/ছাত্রী, এলাকাবাসী ও জয়দেবপুর বাজারে আগত সকলস্তরের বিক্ষুব্দ শ্রমিক-জনতাকে ও জুম্মার নামাজ পড়তে আসা মসল্লীগনকে নিয়ে সেনা ছাউনির আশেপাশের এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল ব্যারিকেট । এমনকি বিক্ষুব্দ জনতা জয়দেবপুর রেল ষ্টেশনে অবস্হানরত মাল গাড়ীর বগি ঠেলে ঠেলে এনে রেল ক্রসিং এর উপর দাড় করিয়ে ব্যারিকেট গড়ে তোলেছিল । একইসাথে বাজার থেকে শুরু করে চান্দনা চৌরাস্তা ও টঙ্গী শিল্পান্চল পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের গাছ কেটে, রাস্তার উপর ইট, বালু ফেলে এবং যানবাহন দিয়ে প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলা হয়েছিল। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে হবিগঞ্জ থেকে আসা আমাদের বয়োবৃদ্ধ পিতা ও অগ্রজ মোঃ আব্দুল বারী ও অংশ গ্রহন করেছিলেন ।

উল্ল্যেখ্য যে শ্রমিক নেতা এম,এ, মোত্তালিবের নির্দেশে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী সিকিউরিটি অফিসার সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার মেজর আব্দুস শহিদ ( যিনি চুনারুঘাট- হবিগঞ্জ জেলার লোক ছিলেন ) ডিজেল প্ল্যান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছ থেকে সকল চাইনিজ ও থ্রী-নট-থ্রী রাইফেল সংগ্রহ করে সংগঠিত প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন । পরবর্তিকালে দীর্ঘ নয় মাস তিনি অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন । এছাড়া এলাকায় যাদের কাছে শটগান, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুক, পিস্তল ছিল তা'নিয়ে এবং দেশীয় অস্ত্র তীর, ধনুক, বল্লম, ইট-পাথর নিয়ে বিক্ষুব্দ শ্রমিক জনতা পান্জাবীদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য জয়দেবপুর বাজারে সমবেত হয়ে দূর্ভেদ্য প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলেছিলেন । ইতিমধ্যেই মুক্তিপাগল শ্রমিক জনতার প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলার খবর ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের কাছে পৌছায় । তিনি অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মাসুদুল হোসেন খান / মেজর শফিউল্লাহ ও মেজর মঈনকে যে কোন মূল্যে ব্যারিকেট সরিয়ে দেওয়ার হুকুম জারী করেন । একইসাথে মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃর্বৃন্দের সাথে মিটিং করার জন্যও প্রস্তাব প্রেরন করেন । ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের অনুরুধে সংগ্রাম কমিটির নেতৃর্বৃন্দ বিকাল আনুমানিক চারটার সময় ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের সাথে বৈঠকে বসেন । ব্রীগেডিয়ার ব্যারিকেট তুলে দেবার জন্য নের্তৃবৃন্ধকে অনুরুধ করেন । নের্তৃবৃন্দ ব্রীগেডিয়ার কে বলেন যে বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে নিরস্ত্র করার জন্য তারা জয়দেবপুরে এসেছে বলে জয়দেবপুরবাসী জানতে পেরেছে । যে কারনে এলাকার শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র, যুবক জনতা প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তুলেছে । আন্দোলনরত বিক্ষুব্দ শ্রমিক-জনতাকে না বুঝিয়ে হুছুট করে এই ব্যারিকেট সড়ানো যাবেনা বলে নের্তৃবৃন্দ ব্রিগেডিয়ারকে জানান । নের্তৃবৃন্দ বাঙ্গালী সৈনিকদেরকে নিরস্ত্র না করে ঢাকায় ফিরে যাবার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব কে অনুরোধ করেন। আলোচনা চলাকালীন সময়ে ব্রিগেডিয়ারকে ভীষন উত্তেজিত ও শংকিত মনে হয়েছিল বলে নেতৃর্বৃন্দ আমাদেরকে জানান । দূঃখজনক ভাবে পান্জাবীরা নের্তৃবৃন্দের অনুরূধ আমলে নেয়নি । বরং বাঙ্গালী অধিনায়ককে প্রয়োজনে গুলি করে হলেও ব্যারিকেট সরিয়ে দিতে হুকুম করেন । পান্জাবীদের অনঢ় অবস্থানের কারনে আলোচনা ব্যার্থ হয় । নেতৃর্বৃন্দ সেনা ছাউনী ত্যাগ করে চলে আসেন । এক পর্য্যায়ে পান্জাবী সেনারা রেল ক্রসিং এর দিকে এগিয়ে এসে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি করার জন্য বাঙ্গালী সেনাদেরকে হুকুম জারী করেন । এমতাবস্হায় বাঙ্গালী সেনারা জনতার উপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি করতে থাকেন । অপরদিকে পান্জাবী সেনারা রেল ক্রসিং এর উপর দাড় করা মাল গাড়ীর বগি ঠেলে ঠেলে ব্যারিকেট ভাঙ্গার চেষ্টা করে এবং গুলি করতে করতে বাজারের দিকে এগিয়ে আসে । বিক্ষুব্দ প্রতিরোধকারীগণ মসজিদের উপর থেকে তাদের হাতে থাকা বন্দুক দিয়ে গুলি করে এবং তীর ধনুক, বল্লম, ইট-পাঠকেল দিয়ে পান্জাবী সেনাদের গুলিবর্ষনের জবাব দিতে থাকে । এমন সময় একটি ট্রাকে করে ৪/৫ জন বাঙ্গীলী সেনাসদস্য সেনা ছাউনিতে ফিরছিলেন । নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর পান্জাবী সেনাদের নির্বিচারে গুলি করতে দেখে বাঙ্গালী সৈনিকেরা আন্দোলনকারীদের পক্ষ নেন । এবং তাদের হাতে থাকা চাইনিজ রাইফেল ও সাব-মেশিনগান দিয়ে পাল্টা গুলি ছুরতে থাকেন । এমতাবস্হায় পান্জাবীদের গুলিতে জয়দেবপুরে মনু খলিফা নামে একজন দর্জী ও নিয়ামত নামে এক কিশোর শহীদ হন এবং আরো বেশ কয়েকজন আহত হন । শ্রমিক জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ জঙ্গীরুপ ধারন করে । বিক্ষুব্দ বীর বাঙ্গালীর আক্রমণ ও প্রতিরোধের মুখে পান্জাবী সেনারা অবিরাম গুলি করতে করতে ঢাকার দিকে পালাতে থাকে । কিন্তু চৌরাস্তার কাছে গিয়ে পান্জাবী সৈন্যরা ব্যারিকেট ও আন্দোলনকারীদের সামনে পড়ে এবং ব্যারিকেট ভাঙ্গার চেষ্টা করে । এমন সময় অসীম সাহসী এক বাঙ্গালী যুবক পান্জাবী এক সেনা সদস্যকে ঝাপটে ধরে । তখন পিছন থেকে ওৎ পেতে থাকা অন্য এক পান্জাবী সেনার গুলির আঘাতে হুরমত আলী নামের সেই বীর বাঙ্গালী যুবক ও কানু মিয়া নামে আরেক যুবক শহীদ হন । বাংলার এই বীর সন্তানদের স্মৃতি রক্ষার্থে ও স্বসস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধকে স্মরন করে রাখার জন্য চান্দনা চৌরাস্তায় সুউচ্চ জাগ্রত চৌরঙ্গী স্মারক ভাস্কার্য্য এবং জয়দেবপুর বাজারে মুক্তমঞ্চ নামে স্মারক নির্মান করা হয় ।

সংঘঠিত স্বশস্ত্র প্রতিরোধের পর পরই ঢাকা থেকে সামরিক জ্যান্তা জয়দেবপুরে কারফিউ জারী করে । সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নের্তৃবৃন্দ রাতেই বাংলার অভিসাংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাত করে ঘটনার অবহিত করেন । সেখান থেকেই শ্লোগান উঠে " জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর " । গগণবিধারী এই শ্লোগান ঢাকা থেকে শুরু করে সমগ্র বাংলাদেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পরে । পরের দিন দেশ/বিদেশের সকল গণ-মাধ্যম পান্জাবী সেনাদের বর্বোরচিত হামলা ও জয়দেবপুরের শ্রমিক জনতার স্বশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর প্রচার করে । ঢাকায় বাংলার অভিসাংবাদিত নেতা শেখ সাহেব সাংবাদিক সম্মেলনে নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর পান্জাবীদের বর্বোরচিত হামলার তীব্র প্রতিবাদ কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন । তিনি ঘোষনা করেন যে জয়দেবপুরের শহীদদের রক্তের উপর পা দিয়ে তিনি আর সামরিক জান্তার সাথে আলোচনায় বসতে পারেন না । বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করে ভবিষ্যত নির্দেশাবলী নিয়ে সংগ্রাম পরিষদের নের্তৃবৃন্দ জয়দেবপুর ফিরে আসেন এবং শ্রমিক আন্দোলনের সহ যোদ্ধাদেরকে নিয়ে ভবিষ্যতে গ্যারিলা যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন ।

অবশেষে ২৫শে মার্চের কালো রাতে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙ্গালীর উপর আক্রমন করে পাকিস্তানী সৈন্যরা বর্বোরচিত ভাবে গণহত্যা শুরু করে । ইতিহাসের জঘন্যতম মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে এম, এ, মোত্তালিব তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী,অবুঝ পূত্র সন্তানের নিরাপত্তার কারনে রুপগন্জের পাচগাওস্হ শ্বশুরালয়ে এবং বয়োবৃদ্ধ পিতাকে হবিগন্জে পৌছে দিয়ে সময় ও সুযোগ বুঝে সীমান্ত পেড়িয়ে ভারতের আগরতলায় তার সাথে মিলিত হবার নির্দেশ দিলেন আমরা দুই অনুজকে। তিনি তার সহকর্মীদেরকে সাঁথে নিয়ে বাংলাদেশ ইন্ড্রাস্ট্রিয়েল ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশন সংক্ষেপে " বিআইডিসি গ্যারিলা ইউনিট " গঠন করে ভারতে চলে যান । মে মাসের মধ্যেই অন্যান্য শ্রমিক ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা আগরতলায় মিলিত হন । মুক্তি বাহিনী প্রধান জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী, মেজর শফিউল্ল্যাহ, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধূরী ও মেজর নুরুজ্জামান সাহেবের সাথে যোগাযোগ রেখে দেশপ্রেমিক শ্রমিকদেরকে নিয়ে ( ৩নম্বর সেক্টরের অধীনে ) পূর্নগঠিত বিআইডিসি গ্যারিলা ইউনিট মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন । যার কমান্ডার হিসাবে দির্ঘ নয় মাস বীরত্ব ও সাহসীকতার সাথে যুদ্ধের নের্তৃত্বদান করেন । মুক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে জনাব মোত্তালিব আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হা, বৃটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস সহ বর্হিবিশ্বের সকল শ্রমিক সংগঠনকে বাংলাদেশের চলমান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ও সার্বিক সাহায্য সহযোগীতা করার জন্য আকাশবানী বেতার কেন্দ্র ও বিবিসি’তে লাইভ সাক্ষাতকার দিয়ে আহ্বান জানান । একই সাথে দেশের অভ্যান্তরে আটকে পরা সকল শ্রমিকদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহায্য সহযোগীতা প্রদান করার জন্য তিনি আকাশবানী বেতার কেন্দ্র থেকে দেশবাসীর কাছে বারবার আহ্বান জানান । তার নেতৃত্বে বিআইডিসি গ্যারিলা ইউনিটের সদস্য হিসাবে আমরা দেশের অভ্যান্তরে ঢাকা, টঙ্গী, ফতুল্লা, ডেমরা,আদমজী, নারায়নগন্জের বিভিন্ন শিল্পান্চলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গ্যারিলা সদস্য হিসাবে পান্জাবীদের তথ্য সংগ্রহ সহ ধ্বংসাত্বক কাজ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন ও পূবাইল রেলওয়ে ব্রীজ ধ্বংসের পূর্বে প্রাথমিক রেকি করার দায়ীত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়েছিল ।

পরিশেষে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও প্রেরনাদানকারী জয়দেবপুরের বীর শ্রমিক-জনতার প্রথম স্বসস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে জীবন বাজী রেখে যে সকল শ্রমিক-জনতা পাকিস্তানী বর্বর পান্জাবী সৈন্যদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল তাদের বীরত্ব ও ত্যাগের স্বিকৃতি তথা স্মৃতি রক্ষার উদ্যেশ্যে ঐতিহাসিক ১৯শে মার্চের স্বসস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করার জন্য প্রতিরোধ যুদ্ধের অন্যতম রুপকার বতর্মান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আ,ক,ম, মোজাম্মেল হকের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি ।

লেখকঃ ১৯ মার্চে স্বসস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের সৈনিক ও সদস্য, বিআইডিসি গ্যারিলা ইউনিট । বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত।

Posted in মতামত


সাম্প্রতিক খবর

নাগরিকত্ব নিয়ে দুটি কথা

photo রোমান বখত চৌধুরীঃ আমি কোন লিগ্যাল এক্সপার্ট নই। তারপরও একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে সাধারণ জ্ঞানে নাগরিকত্ব নিয়ে যা বুঝি তা পেশ করছি। ভুল হলে মন্তব্যে আপনার মতামত রাখেন। সানন্দে গ্রহণ করবো... পাসপোর্ট হচ্ছে একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট। এটি সাধারণত একজন ব্যক্তি যে দেশে জন্মগ্রহন করেছেন সে দেশ ইস্যু করে। একটি পাসপোর্ট দিয়ে একজন ব্যক্তি কোন দেশের তা চিহ্নিত করা যায়। পাসপোর্ট মূলত আন্তর্জাতিক

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment