আজ : ০৪:৫৬, অক্টোবর ১৪ , ২০১৯, ২৮ আশ্বিন, ১৪২৬
শিরোনাম :

নজরুল ইসলাম : একটি নতুন বিবেচনা


আপডেট:০৯:২৩, অগাস্ট ২৩ , ২০১৫
photo

সৈয়দ আলী আহসান : প্রাচীন যুগ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা কবিতার ধারাক্রম পরীক্ষা করলে কয়েকটি বিশিষ্টতা পরিলক্ষিত হয়। সকল যুগের কবিদের মধ্যেই অল্প বিস্তর পরিবর্তনসহ এবং অভিব্যক্তিগত পার্থক্যের মৌলিক বিশিষ্টতা একই রকম ছিল। এই বিশিষ্টতাগুলোকে আমরা নিম্নরূপে চিহ্নিত করতে পারি :
ক. ধর্মীয় আদর্শ এবং বিশ্বাস- এ ক্ষেত্রে উপকরণগত পার্থক্য অবশ্যই আছে এবং প্রকাশময়তাগত পার্থক্য আছে, কিন্তু মূল তত্ত্বগত কোনো পার্থক্য নেই।
খ. আবেগগত বিশেষণ সকল যুগের কবিতার মধ্যেই আছে- কোথাও হয়তো বেশি, কোথাও হয়তো কম।
গ. নাগরিক বৃত্তি এবং গ্রামীণ বোধ সকল যুগের কবিতার মধ্যেই আছে- কোনো ক্ষেত্রে নাগরিক বোধটাই প্রবল, আবার কোনো ক্ষেত্রে গ্রামীণবোধ।
ঘ. জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার ব্যবহার সকল যুগের কবিতার মধ্যেই আছে। অবশ্যই ব্যবহারগত কৌশলের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। ‘চর্যাগীতিকা’য় যেভাবে প্রজ্ঞাকে ব্যবহার করা হয়েছে, নজরুল ইসলাম সেভাবে ব্যবহার করেননি।


আমরা প্রথমে ধর্মীয় আদর্শের কথাই তুলব। ‘চর্যাগীতিকা’য় ধর্মীয় আদর্শ একটি বিশেষ অভিব্যক্তিতে রূপ পেয়েছে। যে কয় শত বছরের মধ্যে ‘চর্যাগীতিকা’গুলো রচিত হয়েছিল সে সময় বৌদ্ধ এবং জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত জনসাধারণ স্থাপিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে কোনো সঙ্কট সৃষ্টি করেনি। যদিও বৌদ্ধ এবং জৈনগণ সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে মানতেন না, তৎসত্ত্বেও আমরা দেখি যে সে সময়কার বৌদ্ধ এবং জৈনগণ অনেক দেবদেবীকে স্বীকার করে বসেছেন এবং ব্রাহ্মণদের জ্যোতিষ, সামুদ্রিক সমস্ত কিছু মেনে নিয়েছেন। এর অনেক আগে যখন গ্রিক, শক, আভীর, গুর্জব ইত্যাদি জাতি বাইরে থেকে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে, সে সময় বৌদ্ধদের প্রতিপত্তি ছিল। বৌদ্ধদের দ্বারা বহিরাগত জাতিগুলো স্বাগত হয় এবং সে সময় তারা সমমর্যাদাসম্পন্ন হয়। যদিও ব্রাহ্মণদের দৃষ্টিতে বহিরাগতগণ ম্লেচ্ছ ও যবন বলে চিহ্নিত হতো, তবুও দেখা যাচ্ছে যে এই সময় বহিরাগতদের অনেকেই বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন, এদের মধ্যে ব্যক্ট্রীয়ান রাজা মিয়ান্দার কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু খ্রিষ্ট্রীয় তিন-চার শতক শেষ হওয়ার পর দেখা গেল যে ভারতে বৌদ্ধরা ক্রমশ অধঃপতিত হচ্ছে। এর কারণস্বরূপ রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন বলেছেন যে বৌদ্ধগণ ভারতের কোনো সামাজিক সংস্থার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কিত রাখতেন না, তারা গৌতম বুদ্ধের সময়কার ধর্মীয় উপাদান নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকতেন। ক্রমশ সামন্তদের প্রশ্রয়ে ব্রাহ্মণদের শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকে এবং আত্মরক্ষার জন্য বৌদ্ধগণ বজ্রমান এবং সহজমানে নিজেদের পরিণত করে নিম্নশ্রেণীর লোকের সমর্থনে বেঁচে থাকার প্রয়াস পান। যোগ-সমাধি, তন্ত্র-মন্ত্র এবং ডাকিনী-যোগিনীর অলৌকিক রহস্য এবং চমৎকারিত্বের দ্বারা জনসাধারণকে নিজেদের দিকে টেনে আনার চেষ্টা করেন। কখনও কখনও সিদ্ধাদের বিচিত্র জীবনকথা লোকভাষায় বর্ণনা করে জনসাধারণের কাছে পরিচিত হবার চেষ্টা করেন। এগুলোকে বলা যেতে পারে দুর্বল ব্যক্তির আত্মরক্ষার অসহায় প্রচেষ্টা। জনতার সমানে জীবন-যাপনের বহুবিধ সমস্যা ছিল, সে সমস্যার চর্চায় অগ্রসর না হয়ে তারা গুহ্য সাধনায় জনসাধারণকে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেন। অবশ্য একটি কথা মনে রাখতে হবে যে জনসাধারণের কাছে উপস্থিত হওয়ার জন্য তারা জনসাধারণের ভাষাকে সম্মান দিয়েছেন। যেখানে ব্রাহ্মণদের ভাষা ছিল সংস্কৃত এবং সুমার্জিত এবং সম্ভ্রান্ত সেখানে বৌদ্ধগণ প্রাকৃতজনের ভাষা ব্যবহার করেছেন।
বাংলা কাব্যে মধ্যযুগে আমরা রূপকচ্ছলে ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং বিবেচনার পরিচয় পাই। সঙ্গে সঙ্গে আবার মানবিক আবেগের প্রকাশ দেখি। এ সবের সঙ্গে আবার প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানের আভাসও লক্ষ্য করা যায়। মধ্যযুগের কবিরা চেষ্টা করেছেন যে, যেভাবেই হোক তারা নিজেদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় চৈতন্যকে আনন্দের অর্ঘ হিসেবে উপস্থিত করবেন। মধ্যযুগের শেষের দিকে যখন রোমান্টিক কাহিনী-কাব্য আরম্ভ হলো তখন তার মধ্যে আমরা সুফি ধারণার আত্মত্যাগের দর্শন দেখতে পেলাম। আবার সঙ্গে সঙ্গে রূপ-মোহের কথাও ক্রীড়াচ্ছলে বর্ণিত হতে দেখলাম। এক কথায় বলা যায়, সামগ্রিকভাবে মধ্যযুগের কাব্য যেমন ধর্মীয় সাধনার উপকরণে ধারণ করছে, তেমনি আবার মানবিক আকাক্সক্ষার পরিচিতিকে তুলে ধরেছে।
অনেকটা সময় বাদ দিয়ে আবার এখন ঊনবিংশ শতাব্দীতে আসি তখন একই সঙ্গে আমরা আবেগের অধিকার এবং জ্ঞানের অধিকারকে প্রকাশ পেতে দেখি। এ সময় কারও কারও মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি বর্ণীকরণ ঘটেছে। এ সময়কার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রজ্ঞার মাধ্যমে উদ্ভূত চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তার প্রধান গ্রন্থ ‘মেঘনাদ-বধ কাব্যে’। আধুনিককালের বিবিধ জিজ্ঞাসা তার কাব্যে রূপ পেয়েছিল। কিন্তু মূলের ধর্মীয় বিবেচনাটি কখনও হারিয়ে ফেলেননি- যদিও তার প্রকাশ ছিল শান্ত ও নিমগ্ন।
পরবর্তীতে আমরা যখন রবীন্দ্রনাথে এলাম তখন তার মধ্যে বিশ্বাসের বিনম্রতাকে পেলাম। ’গীতাঞ্জলি’, ’খেয়া’, গীতিমালা’ ইত্যাদি কাব্যের মাধ্যমে তিনি নিবেদনের যে অসাধারণ চিত্র আঁকলেন তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে আর নেই। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পাণ্ডিত্য ছিল, কিন্তু প্রশমিত হয়েছিল আবেগের দ্বারা। রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়ের যে বলয় নির্মাণ করেছিলেন তার পরিধি ছিল অশেষ। নানাবিধ উপকরণ নিয়ে বিচিত্র কাব্য কৌশলে তিনি তার বিশ্বাসকে এবং ইচ্ছাকে প্রকাশ করেছিলেন। অতীতের ধারাক্রমের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত ছিলেন, কিন্তু কবিতার একটি অনুপম রূপসজ্জায় কবি তাকে প্রকাশ করেছিলেন। মানব জীবনের বিশ্বাস, প্রজ্ঞা এবং আবেগ তার কবিতাকে উজ্জ্বল করেছে।
রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানের পরিধি ছিল বিস্তৃত । ভারতীয় দর্শন, ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য তার নখদর্পণে ছিল পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সূত্র ধরে এগুলোর উপর রবীন্দ্রনাথের অধিগম্যতা গড়ে ওঠে। পিতার সূত্র ধরেই সুফি আদর্শের প্রতি তার আকর্ষণ গড়ে ওঠে। আবার পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি তার কৌতূহল এবং আকর্ষণও ছিল প্রচণ্ড। ভিক্টোরিয়া যুগের ইংরেজি কাব্যধারা তিনি নিয়মিত পাঠ করেছেন এবং সে সময়কার কবিদের অনেকে তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এ ক্ষেত্রে সুইনবার্ন, টেনিসন এবং রসেটির নাম উল্লেখ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় উপমা-রূপকের। যে কারুকর্ম তৈরি করেছেন সেগুলোর মধ্যে এগুলোর প্রভাব ধরা পড়ে। আমরা এ ক্ষেত্রে শুধু একটি কথাই বলব যে রবীন্দ্রনাথ বাক্যজগতে বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন। তার কবিতার উপকরণ, আবেগ, অনুসন্ধান এবং সত্য নির্ণয়ের একটি বিশিষ্ট ভঙ্গি প্রমাণ করে যে কবিতা শুধু আবেগের সৃষ্টি নয়, কবিতার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের অহমিকাও প্রকাশ করা যায়। আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি যে আদিকাল থেকে বাংলা কবিতা জ্ঞানের উপঢৌকন নিয়ে নিয়মিত উপস্থিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এর চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটলো।
রবীন্দ্রনাথের পরে অনন্যসাধারণ প্রতিভার দীপ্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন নজরুল ইসলাম প্রথাগত বিদ্যার অধিকার তার ছিল না বললেই হয়। স্কুলের পাঠ তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তাই বিস্মিত হই যখন আমরা দেখি যে তার জানার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রথমে যে কবিতাটির দ্বারা নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্যক্ষেত্রে পরিচিত হলেন তার নাম ’বিদ্রাহী’। এই একটি মাত্র কবিতাতেই তিনি তার জানার পরিধি যে বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত তার প্রমাণ করেছেন। হিন্দু পুরাণ এবং মহাভারতের কাহিনীকে তিনি এমনভাবে আত্মীকরণ করেছিলেন যে আমাদের মনে হয় এগুলো যেন তার নিজস্ব সত্তার উপলব্ধি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। জন্মসূত্রে তিনি হয়েছিলেন। হিন্দু কিন্তু তিনি হিন্দুদের পৌরাণিক বিশ্বাসের বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হিন্দু পুরাণে দেব-দেবী এবং ক্ষমতাবান ঋষি এবং মনীষীদের নামমাত্র উচ্চারণ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তাদের চারিত্রিক সত্তাকেও উন্মোচন করেছেন। পুরাণের এই ব্যবহার রবীন্দ্রনাথের আছে, কিন্তু তা গৌণ। কিন্তু নজরুল ইসলামের মধ্যে এগুলো প্রবল এবং প্রত্যক্ষ। ছন্দের বন্ধনের মধ্যে এবং অনুপ্রাসের উদ্বেলতার মধ্যে পৌরাণিক নামবাচক শব্দকে যেভাবে বৈভাবে আচ্ছন্ন করেছেন তার তুলনা বাংলা কাব্যক্ষেত্রে আর নেই। এ দিক থেকে ভারতচন্দ্রের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতচন্দ্র অনুপ্রাসের সাহায্যে এবং ছন্দের স্পন্দনের সাহায্যে পৌরাণিক বিশ্বাস এবং রসাবেশকে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে তুলেছিলেন, নজরুল ইসলামও তাই করেছেন। নিম্নে একটি উদাহরণ দিচ্ছি :

আমি হোম-শিক্ষা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রানী-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য!
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য
আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর-
চির উন্নত মম শির!


আবার অন্য দিকে মুসলমানদের বিশ্বাস এবং ধর্মীয় কাহিনী থেকে বহু উপকরণ তিনি ব্যবহার করেছেন, যেগুলো শুধু উপকরণ হিসেবে আসেনি, কিন্তু তাৎপর্য বিশ্বস্ততায় প্রকাশিত হয়েছে। যেমন ‘আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার’ অথবা ‘ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’ অথবা ‘আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া, ভয়ে সপ্ত-নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!’ আমাদের বিস্মিত হতে হয় এ কথা ভেবে, যে বালক শৈশবে গৃহহারা হয়ে বাউণ্ডেলে হিসেবে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং কোথাও স্থির হয়ে বস জ্ঞান-চর্চার সুযোগ পায়নি এবং যৌবনের উন্মেষে মেসেপটোমিয়ার যুদ্ধে যাবে বলে করাচি পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সেই অশিক্ষিত অপরিচিত বালক বাংলা কাব্যক্ষেত্রকে প্রচণ্ড উন্মাদনায় আলোড়িত করল। শুধুমাত্র তাই নয় জ্ঞানের গভীরতায় সে ব্যক্তি তার জানার পরিধিকে অসম্ভব বিস্তৃতি করেছিল। আমরা এটুকু মাত্র জানি যে করাচি অবস্থানকালে তিনি উর্দু ও ফারসি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং এক মৌলভীর কাছে আরবি পাঠ নিয়েছিলেন। এটাও কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। আমরা বুঝতে পারছি যে নজরুল ইসলামের স্মৃতিবোধটি ছিল প্রচণ্ড। তিনি যা পাঠ করেছেন এবং যা শুনেছেন সব কিছুকে স্বীকরণ বা আত্মীয়করণ করেছিলেন বিস্ময়কর ক্ষমতার সাহায্যে। হিন্দু পুরাণ এবং রামায়ণ-মহাভারতের পাঠ তিনি নিয়েছিলেন কবি মোহিতলাল মজুমদারের কাছ থেকে। সেগুলোতে কোনোরূপ অনুশীলন ছিল না। কিন্তু তিনি যা শুনেছিলেন তাই-ই স্মৃতিতে ধারণ করেছিলেন এবং বলিষ্ঠ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির সাহায্যে সেগুলো ব্যবহারও করেছিলেন অবলীলাক্রমে। পাশ্চাত্য সাহিত্যও যে তিনি পাঠ করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে। সেখানে দেখতে পাই যে, তিনি শেলীর কাব্য পাঠ করেছেন এবং বিখ্যাত আমেরিকান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের কাব্যচেতনাকে গভীরভাবে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার অনেক কবিতায় ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তার ‘অগ্রপথিক’ কবিতাটি ওয়াল্ট হুইটম্যানের একটি কবিতার অনন্য-সাধারণ অনুবাদ। ‘অগ্রপথিক’কে তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যে এটাকে নতুন সৃষ্টি বলে মনে হয় এবং কোনো ক্রমেই অনুবাদ বলে সাব্যস্ত করা যায় না। নজরুল ইসলামের গ্রহণ করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ, তার মধ্যে অনুকরণের আভাস নেই, কিন্তু আত্মীকরণের দীপ্তি আছে।
কবি ইয়েট্স এক সময় অসাধারণ রোমান্টিক কবিতা লিখেছিলেন। ১৮৯০ সালের দিকে এ কবিতাগুলো সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথের কিছু গানে ইয়েট্সের কাব্যব্যঞ্জনার কিছু প্রভাব আছে। রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত গান আছে যেখানে কল্পনার অতিরেক সৃষ্টি করে রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ ভাব-বিহ্বলতা তৈরি করেছিলেন। গানটির প্রথম দু’চরণ আমার মনে আছে : ‘ওগো বধূ সুন্দরী, তুমি মধু মঞ্জুরি’। এই গানটিতে পুষ্পবিলাস রয়েছে। বধূকে নানাভাবে নানা রকমের ফুল দিয়ে সাজানোর কথা আছে। ঠিক একই বিভূষণের গান আছে নজরুল ইসলামের। নজরুলের গানটি কল্পনার লীলাবিলাসে অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ। এক অতুলনীয় কল্পনা-বিলাসে কবি তার প্রিয়তমাকে সাজিয়েছেন। গানটি নিম্নে আমি পুরো উদ্ধৃত করছি :

মোর প্রিয়া হবে, এস রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল॥

কণ্ঠে তোমার পরাব বালিকা
হংস সারির দোলানো মালিকা
বিজলি-জরীন ফিতায় বাঁধিব মেঘ-রং এলোচুল ॥

জ্যোস্নার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায়,
রামধনু হতে লাল রং ছানি’ আল্তা পরাব পায়।
আমার গানের সাত সুর দিয়া
তোমার বাসর রচিব প্রিয়া,
তোমারে ঘিরিয়া গাহিবে আমার কবিতার বুলবুল ॥

কবি ইয়েট্সের যে কবিতাটির প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ইসলামের গান দুটি রূপ পেয়েছে তার উদ্ধৃতি আমি দিতে পারছি না, কিন্তু বাংলাতে তার ভাবটি আমি তুলে ধরছি। কবি তার প্রিয়তমার জন্য আকাশের উদার বিস্তৃতি কামনা করেছেন, তারকাখচিত নভোমণ্ডলের চাদর খুঁজে আনতে চেয়েছেন যেন ’তার প্রিয়তমা লঘু সঞ্চারে তার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে। সোনালী স্বর্ণ এবং রৌপ্যখচিত মহার্ঘ্য আস্তরণ তিনি তার পদতলে বিছিয়ে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু এগুলো কিছুই তিনি দিতে পারছেন না কেননা তিনি একজন দরিদ্র কবি। তার শুধু স্বপ্ন আছে, তিনি সেই স্বপ্ন বিছিয়ে দিয়ে প্রিয়তমাকে বলছেন : ‘তুমি লঘুপায়ে হেঁটে যাও, কেননা তুমি স্বপ্নের উপর দিয়ে হাঁটছো।’ ইয়েট্সের এ কবিতাটি অতুলনীয়। এর কাছাকাছি পৌঁছানো কারও পক্ষেই সম্ভব নয়, কিন্তু মনে হয় নজরুল ইসলাম এর কাছাকাছি পৌঁছেছেন। তারকাখচিত যে বৈভবের কথা ইয়েট্স বলেছেন সে বৈভব দিয়ে নজরুল ইসলাম তার প্রিয়তমাকে সাজিয়েছেন। কবির কল্পনাবিলাস যে কত মধুর হতে পারে তা আমরা এই গানের মধ্যে দেখতে পাই।
নজরুল ইসলামের ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যগ্রন্থটিতে তার সুফি তত্ত্বজ্ঞানের গভীর পরিচয় আমরা খুঁজে পাই। ‘নতুন চাঁদ-এর ‘অভেদম্’ কবিতার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। এখানে সুফি তত্ত্বের পরম পুরুষকে অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে। কবিতাটির প্রথম স্তবক আমি এখানে উদ্ধৃত করছি :

দেখিয়াছ সেই রূপের কুমারে, গড়িছে যে এই রূপ?
রূপে রূপে হয় রূপায়িত যিনি নিশ্চল নিশ্চুপ!
কেবলই রূপের আবরণে যিনি ঢাকিছেন নিজ কায়া
লুকাতে আপন মাধুরী যেজন কেবলি রচিছে মায়া!
সেই বহরূপী পরম একাকী এই সৃষ্টির মাঝে
নিষ্কাম হয়ে কিরূপে সতত রত অনন্ত কাজে।
পরম নিত্য হয়ে অনিত্য রূপ নিয়ে এই খেলা
বালুকার ঘর গড়িছে ভাঙিছে সকাল সন্ধ্যা বেলা।
আমরা সকলে খেলি তারই সাথে, তারই সাথে হাসি কাঁদি
তারই ইঙ্গিতে পরম ‘আমি’রে শত বন্ধনে বাঁধি।
মোরে ‘আমি’ ভেবে তারে স্বামী বলি দিবাযামী নামি উঠি,
কভু দেখি-আমি তুমি যে অভেদ, কভু প্রভু বলে ছুটি।

সুফি দর্শনের এবং বৈষ্ণব রূপাভিব্যক্তির গভীরে প্রবেশ না করলে কারও পক্ষেই অভেদ তত্ত্ব বর্ণনা করা সম্ভব নয়। প্রেমের লীলার মধ্য দিয়ে যেখানে পরম পিতা এবং মানুষ একীভূত হয়ে গেছে প্রেমের ব্যঞ্জনায় তারই একটি পরিচয় পাই নজরুলের কবিতায়। সুফি রসতত্ত্ব এবং বৈষ্ণব রূপতত্ত্বের গভীরে নজরুল ইসলাম প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ‘অভেদম্’ কবিতাটি লেখা তার পক্ষে সম্ভবপর হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম উদাসী মানুষদের সান্নিধ্যে পেয়েছেন এবং তাদের গভীর ইচ্ছাকে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আমরা গ্রন্থপাঠের মধ্য দিয়ে জ্ঞান আহরণ দেখি না, বরঞ্চ এখানে আমরা ধারণার গভীরে বিলুপ্তির পরিচয় পাই। ‘নতুন চাঁদ’-এর আরেকটি কবিতায় সুফিতত্ত্বের গভীর প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাটির নাম ‘আর কতদিন?’। এর দ্বিতীয় স্তবকটি উদ্ধৃত করছি :

আমি ছিনু পথ-ভিখারিনী, তুমি কেন পথ ভুলাইলে,
মুসাফির-খানা ভুলায়ে আনিলে কোন্ এই মঞ্জিলে?
মঞ্জিলে এনে দেখাইলে কার অপরূপ তস্বির,
‘তসবি’তে জপি যত তার নাম তত ঝরে আঁখি-নীর!
‘তশবিহি’ রূপ এই যদি তার ‘তন্জিহি’ কিবা হয়,
নামে যার এত মধু ঝরে, তার রূপ কত মধুময়।
কোটি তারকার কীলক রুদ্ধ অম্বর-দ্বার খুলে
মনে হয় তার স্বর্ণ-জ্যোতি দুলে ওঠে কুতূহলে।
ঘুম-নাহি-আসা নিঝ্ঝুম নিশি-পবনের নিঃশ্বাসে
ফিরদৌস-আলা হতে যেন লালা ফুলের সুরভি আসে।
চামেলী জুঁই-এর পাখায় কে যেন শিয়রে বাতাসব করে,
শ্রান্তি ভুলাতে কী যেন পিয়ায় চম্পা-পেয়ালা ভরে।

যতদূর মনে নজরুলের দিওয়ান এবং গজল পাঠ করতে গিয়ে সুফিতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। উপরের উদ্ধৃতির মধ্যেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফিসের মধ্যে যেভাবে তন্ময় হয়েছিলেন, নজরুল ইসলামও সেভাবেই তন্ময় হয়েছিলেন। কিন্তু মহর্ষি ছিলেন মহাপণ্ডিত, অন্যদিকে প্রথাগত পাণ্ডিত্য নজরুলের ছিল না। নজরুল ইসলামের মধ্যে আমরা উপলব্ধি গভীরতা লক্ষ্য করি। তিনি তার আপন চৈতন্যে সুফি সাধণার মূল রসাবেশটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুফিতত্ত্ব খুব সহজবোধ্য জিনিস নয়, গভীর উপলব্ধি না থাকলে কোনো ব্যক্তিই সুফিদের ধ্যানলোক বা সমাধিকে আবিষ্কার করতে পারে না। সুফিরা বলে থাকেন যে আপনাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তারা মহাশক্তিকে স্পর্শ করেন। নজরুল ইসলাম বলছেন, এই পরম শক্তিই পৃথিবীতে প্রথম ঈদের চাঁদরূপে প্রকাশ পেয়েছিল। কথাটি রূপক। কবি বলতে চাচ্ছেন প্রকৃতির যে লীলা বৈচিত্র্য এবং আকাশের নক্ষত্র এবং সূর্য যেগুলো আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে, সেগুলোর মধ্য দিয়ে বিধাতা আত্মপ্রকাশ করেন। জীবন যাপনের দৃষ্টান্তের মধ্যে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে কর্মময় জীবন দেখি। নজরুল ‘নতুন চাঁদ’-এর একটি কবিতায় ‘কেন জাগাইলি তোরা’-এর মধ্যে তার জাগরণের বক্তব্য তুলে ধরেছেন :

মহা সমাধির দিকহারা লোকে জানি না কোথায় ছিনু
আমরা খুঁজিতে সহসা সে কোন শক্তিরে পরশিনু-
সেই সে পরম শক্তিরে লয়ে আসিবার ছিল সাধ-
যে শক্তি লভি এল দুনিয়ায় প্রথম ঈদের চাঁদ-
তারি মাঝে কেন ঢাকঢোল লয়ে এলি সমাধির পাশ
ভাঙাইলি ঘুম? চাঁদ যে এখনো ওঠেনি নীল আকাশে।

নজরুল ইসলামের ‘মরু-ভাস্কর’ কাব্যগ্রন্থটি রাসূলে খোদার আংশিক জীবন-কথা। যতটুকু তিনি লিখেছেন সেখানেই তিন সম্পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন কি না জানি না, তবে এ হতে পারে যে নজরুল ইসলাম বিবি খাদিজার সঙ্গে বিবাহ পর্যন্তই লিখতে চেয়েছিলেন। এই জীবনী-কাব্যটি সুনিপুণভাবে রচিত একটি আবেগবহুল কাব্য। তিনি ইতিহাসের ধারাকে অনুসরণ করে ইতিহাসের ধারাভিত্তিক কাব্য রচনা করেননি, তিনি আবেগের উচ্ছলতা এবং বিনয়ের সম্ভাষণে রাসূলের জীবনকে অবলোকন করেছিলেন। নিবেদনের গভীরতা এবং আবেগের অন্তরঙ্গ উচ্ছ্বাস নিয়ে এই বাক্যগ্রন্থটি রূপ লাভ করেছে। প্রথম সর্গে অবতরণিকা থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দিলে আমরা বক্তব্য স্পষ্ট হবে-

রবি-শশী-গ্রহ-তারা-ঝলমল গননাঙ্গন তলে
সাগর উর্মি-মঞ্জীর পায়ে ধরা নেচে নেচে চলে।
তটিনী-মেখলা নটিনী ধরার নাচের ঘূর্ণি রাগে
গগনে গগনে পাবকে পবনে শস্যে কুসুম-বাগে।
সে আজান শুনি থমকি দাঁড়ায় বিশ্ব-নাচের সভা,
নিখিল-মর্ম ছাপিয়া উঠিল অরুণ জ্যোতির জবা।
দিগ্দিগন্ত ভরিয়া উঠিল জাগর পাখির গানে,
ভুলোকে দ্যুলোকে প্লাবিয়া গেল রে আকুল আলোর বানে
আরব ছাপিয়া উঠিল আবার ব্যোম পথে ‘দীন্’ ‘দীন্’।
কাবার মিনারে আবার আসিল নবীন মুয়াজ্জিন।

নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতার ধারাক্রমকে লক্ষ্য করে আবেগের সম্ভাষণ যেমন এনেছেন, তেমনি প্রজ্ঞার বিভূষণ দ্বারা কাব্যকে সুশোভিত করেছেন। আবার ধর্মীয় চৈতন্যের বিনম্র সমর্থন কবিতায় স্পষ্ট করেছেন। এভাবেই নজরুল ইসলামকে আমরা পাই বাংলা কাব্য ধারায়। বাংলা কাব্য ধারার স্রোতে যেমন একজন ভাসমান পুরুষ তেমনি আবেগে এবং উচ্ছলতায় একজন অসাধারণ দীপ্ত পুরুষ। নজরুল ইসলাম একজন স্বাভাবিক চৈতন্যের অধিকারী একজন কবি নন, তিনি বলিষ্ঠ প্রজ্ঞার অধিকারী হয়ে একজন অসাধারণ চেতনলোকের কবিকণ্ঠ।



সাম্প্রতিক খবর

বাংলা পোস্ট পত্রিকার ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন

photo লন্ডনবিডিনিউজ২৪ঃ বুধবার ৯ অক্টোবর সাপ্তাহিক বাংলা পোস্ট পত্রিকার ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে পত্রিকার কার্যালয়ে এক আনন্দ সভার আয়োজন করা হয়। বাংলা পোস্টের অনারারী চেয়ারম্যান শেখ মোঃ মফিজুর রহমান ও ফাউন্ডার তাজ চৌধুরীর কেক কাটার মাধ্যমে আনন্দ সভার কাজ শূরু হয়। এসময় বাংলা পোস্ট পরিবারের সকল সদস্য উপস্থিত ছিলেন। শেখ মোঃ মফিজুর রহমান তার স্বাগত বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment