আজ : ০৭:৩২, ফেব্রুয়ারি ২৫ , ২০১৮, ১৩ ফাল্গুন, ১৪২৪
শিরোনাম :

খাল কেটে কুমির আনছে ভারত


আপডেট:১২:২৪, নভেম্বর ২৮ , ২০১৭
photo

আসিফ হাসান: যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানকে নিয়ে চার দেশীয় জোটে যোগ দিতে চাইছে ভারত। কেবল যোগ নয়, বরং এ জোটটি যাতে দ্রুত গঠিত ও আরো সক্রিয় হয়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে। টার্গেট- ঠেকাতে হবে চীনকে।

অবশ্য ঠিক এই চারটি দেশকে নিয়ে জোট গড়ার ধারণা নতুন নয়। আগেও একবার চেষ্টা করা হয়েছিল। জাপানের প্রস্তাবটি সেবার ব্যর্থ হয়েছিল বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া আপত্তি করায়। এবার অবশ্য প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চীন তখনকার চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার নীতি থেকে সরে এসেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বর্তমানে পরিত্যক্ত ‘পাইভোট’ থেকে সরে সুদূরপ্রসারী নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। তারা নয়াদিল্লির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে একটি সামরিক জোট করা যায়। প্যাসিফিকের মার্কিন কৌশলের সামরিক সমীকরণে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই দৃশ্যত ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ধারণা অবতারণা করা হয়েছে।

ম্যানিলায় আসিয়ান বার্ষিকী এবং পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে চার দেশের নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন, তবে তাদের কর্মকর্তারা আলাদাভাবে চার দেশীয় জোট হিসেবে সভা করেছেন। তবে চীন যাতে বৈরী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন না করে, সে ব্যাপারে তাদের সজাগ দৃষ্টি ছিল। আর চীনও এ ব্যাপারে যথেষ্ট মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কর্মকর্তাদের সভার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি পুরোপুরি উন্মুক্ত, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল দীর্ঘ মেয়াদে এ অঞ্চল এবং সার্বিকভাবে পুরো বিশ্বের সব দেশের স্বার্থ পূরণ করবে। অবশ্য ভারতীয় বিবৃতিতে কিছুটা অজ্ঞতা দেখা গেছে তাতে উত্তর কোরিয়া ইস্যুটি স্থান না পাওয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানি বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়া ইস্যুটিই গুরুত্ব দেয়া হয়।

গত ২৫-২৬ অক্টোবর টিলারসনের ভারত সফরের সময় দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী সচিব অ্যালিস ওয়েলস সঙ্গের সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওয়াশিংটন চার দেশীয় জোট নিয়ে শিগগিরই সভা করার কথা ভাবছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক কাঠামোতে একই মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশগুলোকে একত্রিত করার ধারণাই এটি। চীনকে লক্ষ্য করেই এই জোট করার কথা তিনি অস্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, লুণ্ঠনমূলক অর্থায়ন কিংবা অটেকসই ঋণের (পড়ুন : চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ) বদলে অবকাঠামো উন্নয়ন কামনাকারী দেশগুলোর মধ্যে ‘সমন্বিত’ প্রয়াস চালানোর কথা বলেন।

এর কয়েক দিন আগে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো ফোরামটি পুনর্জীবনের প্রস্তাব করেন। তিনি এ নিয়ে টিলারসন এবং অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপের সাথে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর চীনের সাথে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমবারের মতো আইডিয়াটি সামনে এনেছিলেন। ২০০৪-০৫ সালে চীনে জাপান-বিরোধী বিক্ষোভে টোকিও বেশ কষ্ট পায়। ধারণা করা হচ্ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের ওপর জাপান যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীনের প্রতি জাপানের বিপুল সহায়তা এবং বিপুল বাণিজ্যের কারণে ওই বৈরিতার অবসান ঘটেছে। আসলে চীন সময়ের অপেক্ষা করছিল।

অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘পাইভট টু এশিয়া’ নীতি অনুসরণ করে তার নৌশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ এ অঞ্চলে মোতায়েন করে। যুক্তরাষ্ট্র ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপও (টিপিপি) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। চার দেশীয় জোটের সূচনা এবং এশিয়া-প্যাসিফিককে ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে’ পরিণত করা সত্ত্বেও ট্রাম্প তার নীতি কিভাবে কার্যকর করবেন তা স্পষ্ট নয়। এর মানে কি দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার জন্য আরো শক্তি প্রদর্শিত হবে? এটি ওবামার ‘পাইভোট’ থেকে কতটা ভিন্ন হবে? জোট গঠনের আগে এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া জরুরি।

প্রথমবার যখন প্রচার করা হয়েছিল, তখন চার দেশীয় জোটের ব্যাপারে বাস্তব কারণেই সংশয়ে ছিল ভারত। এখন ওই প্রস্তাবটি নতুন করে আসায় তারা এ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। সদ্য নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর অ্যাবের জাপান প্রতিরক্ষা, সাগর নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

চার দেশীয় জোট গড়ার প্রথম উদ্যোগটি ভুণ্ডল হয়েছিল প্রথমে অস্ট্রেলিয়া রাজি না হওয়ায় এবং ভারতেরও প্রায় একই অবস্থান গ্রহণ করায়। ঠিক ওই সময়টাতেই কাকতালীয়ভাবে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ওই সময় চীনা অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা হয়, দেশটির সামরিক শক্তিও বেশ বাড়তে থাকে।
অনেকের অভিমত, চীন এখন এতই বড় হয়ে গেছে যে তাকে আর সংযত করা যাবে না। অন্যদিকে, চার দেশীয় জোটটি চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে সৎ মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে এবং ওই মূল্যায়নের ব্যাপারে সব দেশ আন্তরিক কি না তা বিবেচনা করা দরকার। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস সবার জানা। ১৯৮০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী পল কিটিংকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জাপান-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ হলে তিনি কার পক্ষ নেবেন। তিনি জাপানের কথা বলেন। জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন একই যুক্তি খাটে চীনের ব্যাপারে। চার দেশীয় জোটের অন্যান্য দেশের চেয়ে চীনের ওপরই অস্ট্রেলিয়া অনেক বেশি নির্ভরশীল। আর জাপান এখনো অনেকটাই ‘শান্তির’ নীতিতে বিশ্বাসী। ফলে অ্যাবের বিদায়ের পরপরই তারা অবস্থান বদলাতে পারে। তখন চার দেশীয় জোটের অবস্থা কী হবে?

অনেক দিক থেকেই ভারত ও জাপান মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে চীন। কিন্তু বিরোধ মীমাংসায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হলে কি চার দেশীয় জোট একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে? অনেকেই বলছেন, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আর যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি কি? তার সব কথা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নিয়ে। আরব সাগর কিংবা পারস্য উপসাগরের সাথে সম্পর্কিত কোনো ইস্যুতে সে ভারতের সাথে আলোচনা করতে নারাজ। অথচ ভারতের জন্য এ দুটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিকের মানে হলো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি ভারতের সামরিক প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কিত ভারতের উদ্বেগজনক ইস্যু এবং পারস্য উপসাগরের অতি উত্তপ্ত বিষয়াদিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

শক্তির নিরিখে বলা যায়, চীনকে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু এ দেশটির পরিণতি কেউ জানে না। বিপুল সম্পদ ও সামর্থ্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি তেমন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করছে না। চীনকে যেমন ঐক্যবদ্ধ ও আগ্রাসী ভঙ্গিমায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন মনে হচ্ছে না। বরং আমেরিকা কী এবং কারা তা নিয়ে প্রায় সহিংস সঙ্ঘাত চলছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সাথে ভারসাম্য বিধানে কার্যকর নেতৃত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করাটা হবে বিপজ্জনক বিষয়।

ভারত মনে করে, ভারত মহাসাগর তার আঙিনা। এখন সেখানেই অন্যদের প্রবেশ করার সুযোগ দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বলা যেতে পারে, ভারত সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বেঁধে খাল কেটে কুমির নিয়ে আসছে। তার সীমানার মধ্যে অন্যান্য দেশকে নিয়ে আসার পর নিজেই একসময় কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে।

Posted in মতামত


সাম্প্রতিক খবর

নিম্ন আদালতের নথি হাইকোর্টে এলে খালেদা জিয়ার জামিনের আদেশ

photo ঢাকা প্রতিনিধি: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার করা জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। নিম্ম আদালত থেকে রায়ের নথি পাওয়ার পর এ বিষয়ে আদেশ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট। রোববার দুপুরে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ আদেশ দেন। সংখ্যাধিক্য আইনজীবীর কারণে এজেলাশ কক্ষের পরিবেশ ‘অস্বাভাবিক’ হওয়ায়

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment