আজ : ০৮:৪৭, জুন ২৩ , ২০১৮, ৯ আষাঢ়, ১৪২৫
শিরোনাম :

বিচিত্র স্যালুকাস !


আপডেট:১০:৪৯, অগাস্ট ১৮ , ২০১৭
photo

অলিউল্লাহ নোমান: একটি রায়কে কেন্দ্র করে তেলেসমাতি কারবার চলছে। কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটা এখনই বলা মুশকিল। রাজনৈতিক উত্তেজনা রায়ের মূল আদশকে কেন্দ্র করে নয়। মূল উত্তেজনা হচ্ছে রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণে। কো রাজনৈতিক নেতাকে খাটো করা হল , নাকি উচ্চাসনে বসানো হল সেটাই হচ্ছে উত্তেজনার মূল সূত্র। অর্থাৎ দেশের রাজনীতি নিয়ে রায়রে পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে সেটাই উত্তেজনার কারন। বিচারপতি অপসারনের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়া হয়েছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে। সেটা আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে রায়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত সুপ্রিম জুডিডিশয়াল কাউন্সিলকে তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পেশ করতেন। সেই আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার ছিল রাষ্ট্রপতির। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে সেটাই আবার ফিরিয়ে আনা হয় সংবিধানে। ষোড়শ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ক্ষমতা ফিরে পায়।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।

(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন)

তবে এটাও ঠিক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যাই করুক, শেষ পর্যন্ত সরকারই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের আলোকে চুড়ান্ত আদেশ জারি করার এখতিয়ার হচ্ছে রাষ্ট্রপতির। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে সিদ্ধান্ত নেয়া বা অদেশ জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের এখতিয়ার তদন্ত এবং সুপারিশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তদন্তে যাই উঠে আসুক বা সুপারিশে যাই থাকুক প্রধানমন্ত্রীর উচ্ছায় চুড়ান্ত ফয়সালা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আদেশ জারি করেন। কারন সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে শুধুমাত্র দু’টি কাজ নিজের এখতিয়ারে করার জন্য অনুমোদন করে। একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং আরেকটি হচ্ছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। এর বাইরে সকল কাজে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে একবারই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল একটি তদন্ত করেছিল। ২০০৩ সালের মে মাসের ঘটনা। তৎকালীন সুপ্রিমকোর্ট বার সভাপতি ব্যারিষ্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ হঠাৎ করেই আইনজীবীদের সমাবেশে বললেন, কোন কোন বিচারপতি দিনে আদালতে বসেন রাতে নিজের চেম্বারে কাজ করেন। বিচারপতি হওয়ার পর সুপ্রিম সাবেক চেম্বারে বসা বা ক্লায়েন্ট দেখাশোনা করা আচরণবিধি অনুমোদন করে না। তাঁর এই বক্তব্যের দুইদিন পরই একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করলেন। আনুষ্ঠানিক লিখিত নালিশ করলেন প্রধান বিচারপতি বরাবরে। সেই নালিশে বলা হল বিচারপতি হওয়ার পরও একজন পুরাতন ক্লাইয়েন্টকে জামিন পাইয়ে দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর সাবেক জুনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমে ওই জামিন আবেদন সংশ্লিষ্ট একটি বেঞ্চে পেশ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ওই বিচারপতি। এনিয়ে তখন রীতিমত তোলপাড়। আওয়ামী পত্রিকা ও মিডিয়া গুলোতে ফলাও করে প্রচারণা শুরু করে। প্রাথমিক নালিশে তদন্তের আগেই অভিযুক্ত বিচারপতির মিডিয়া ট্রায়াল সমাপ্ত হয়ে যায়। এদিকে অভিযোগ পেয়ে চুপ থাকেনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। রোকন উদ্দিন মাহমুদের নালিশের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করে। তখন প্রধান বিচারপতি ছিলেন কে এম হাসান। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কর্মে প্রবীন আরো দুই বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এটাকে ক্যামেরা ট্রায়াল হিসাবে ঘোষণা করে। তবে ব্যারিষ্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদুরে কল্যানে কোন কিছুই আর তখন গোপন থাকেনি। প্রতিদিনের প্রসিডিংস নিয়মিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। শুধু অভিযোগকারীরা কি কি বললেন সেটাই প্রকাশ পেতে থাকে। এতে পুরো জাতির সামনে বিচারপতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে স্বভাবতই এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এছাড়া রোকন উদ্দিন মাহমুদের নালিশের পর দিন থেকেই ওই বিচারপতির আসন নেই। সাময়িকভাবে বিচারের আসনে বসা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ জারি হয় তার উপর।

অবশেষে তদন্তের ফলাফলে বলা হয়, অভিযোগের কোন সুনির্দিষ্ট প্রমান পাওয়া যায়নি। তারপরও যেহেতু একটি অভিযোগ উঠেছে সুতরাং তাঁকে আর বিচারপতির আসনে রাখা উচিত হবে না। এই ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মোদ্দা কথা। তদন্তে প্রমানিত না হওয়ার পরও শুধুমাত্র রোকন উদ্দিন মাহমুদ যেহেতু অভিযোগ করেছেন তাই বিচারপতিকে অপাসরনের ব্যবস্থা করল তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার। ওই অপসারন আদেশ চ্যালেঞ্জ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিচারপতি। হাইকোর্ট বিভাগে একটি রীট আবেদনর মাধ্যমে অপসারণ আদেশটি চ্যালেঞ্জ করা হয়। এতে তিনি দাবী করেছিলেন তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তারপরও তাঁকে অপসারন করা অসাংবিধানিক। দীর্ঘ শুনানী শেষে বিচারপতিকে অপসারনের আদেশ অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগ। এখানে ওই বিচারপতি বিজয়ী হন। তারপরও আর তাকে বিচারকের আসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী বিচারকের আসন ফিরে পেতে তিনি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছেন। কোন কাজ হয়নি তাঁর আবেদনে। দীর্ঘ একমাস পর এক আইনজীবী ‘জনস্বার্থে’ হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন। সেই লিভ টু আপিলের সূত্র ধরে স্থগিত করা হয় হাইকোর্টের রায়। বছরের পর বছর শুনানীর অপেক্ষায় ছিল আপিলটি। তদন্তে নির্দোষ হওয়ার পরও অপসারিত বিচারপতি বার বার আপিল বিভাগের আবেদন করেছিলেন মামলাটি শুনানী নিষ্পত্তি করার জন্য। সেখানেও কাজ হয়নি। এর বাইরে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আর কখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে বসতে হয়েছে এমন নজির নেই।

এই কাসুন্দি টানলাম একটি বিশেষ কারনে। আপিল বিভাগের যে রায় নিয়ে তোলপাড় চলছে সেটি হচ্ছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে। আর এই রায় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই প্রধান বিচারপতি একটি পক্ষকে তাঁর সরকারি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। রায়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষ হচ্ছে সরকারি দল। সেই সংক্ষুব্ধ সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক গত শনিবার (১২ আগষ্ট ২০১৭) প্রধান বিচারপতের আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশ নিলেন। নৈশভোজের পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জানালেন আলোচনা হয়েছে, আলোচনা আরো হবে। বিচারপতি কি আলোচনা করছেন রায়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষের নেতার সাথে!

এই আলোচনা বঙ্গভবন পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর দুইদিন পর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার উপস্থিতিতে বঙ্গভবনেও আলোচনা হয়েছে। তখনো সেই আলোচনা থেকে বের হয়ে ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন আলোচনা অব্যাহত আছে। এর দুইদিন পরই আবার বঙ্গভবনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেখানেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে এই রায় নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যদের উপস্থিতিতে আলোচনা নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কারন এখানে প্রধান বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন না। আপত্তি হচ্ছে প্রধান বিচারপতি কোন রাজনৈতিক নেতাকে বাসায় ডেকে রায় নিয়ে আলোচনা করার এখতিয়ার রাখেন কি না। এছাড়া রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিত রায়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষের নেতার সাথে আলোচনায় বসতে পারেন কিনা সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন!! সুপ্রিমকোর্ট রুলস বা বিচারপতিদের আচরণবিধি তাঁকে এই এখতিয়ার দিয়েছে কি না?

পুরাতন ক্লাইয়েন্ট একজন বিচারপতির সাথে দেখা করে পরামর্শ নেয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তাতেই হৈ চৈ, তোলপাড়। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে তদন্তে বসানো হয়। তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ প্রমানিত হয়নি। তারপরও বিচারপতির চাকরি যায়।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অভিযোগকারী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য নেয়। অভিযোগের পক্ষে আরো দুইজন সাফাই সাক্ষীর বক্তব্য নেয় সুপ্রিম জুডিশয়াল কাউন্সিল। এর মধ্যে একজন সাক্ষী বর্তমানে বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জড়িত এবং একটি সম্পাদকীয় পদে রয়েছেন। এছাড়া রোকন উদ্দিন মাহমুদের নিকট অভিযোগকারী সেই ক্লাইয়েন্টেরও বক্তব্য নেয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। বক্তব্য নেয়া হয় অভিযুক্ত বিচারপতির। শেষ পর্যন্ত অভিযোগকারীরা তথ্য প্রমাণ দিয়ে সেটা প্রমাণিত করতে পারেননি। তাতে কি!

অভিযোগ যখন উঠেছে বিচারপতির আসনে বসা ঠিক হবে না। এই যাদের মনোভাব ছিল রায়ে সংক্ষুব্দ পক্ষের সাথে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বৈঠক নিয়ে এখন তারা কি বলবেন! মিডিয়া ওয়ালাদের মুখেও সেই প্রশ্ন শোনা যায় না এখন! বিচিত্র স্যালুকাস এই দেশ। পার্থক্যটা হচ্ছে এখন আওয়ামী জামানা। তখন ছিল চার দলীয় জোটের শাসন। তাই তখন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য মিথ্যা যাছাইয়ের আগেই মিডিয়া ট্রায়ালে ফাঁসি। আর আওয়ামী জামানায় বিচারপতি প্রকাশ্যে সংক্ষুব্ধ পক্ষের রাজনৈতিক নেতার সাথে নৈশভোজে বসলেও সেটা আলোচনা। এ নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবে না।

Posted in মতামত


সাম্প্রতিক খবর

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা: দ্রুত শুনানি চেয়ে আবেদন করবে দুদক

photo ঢাকা সংবাদদাতা: আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার দ্রুত আপিল শুনানি চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আগামীকাল রবিবার (২৪ জুন) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে কমিশনের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত আবেদন করা হবে। শনিবার (২৩ জুন) দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এ তথ্য জানান।খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশের

বিস্তারিত

0 Comments

Add new comment